ম্যাক, আমি আর বাংলা

 

শুরু:

আমি এস, এম, রাইয়ান কবির। কম্পিউটারের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৭ সালে আমার এস,এস,সি পরীক্ষার পর। আমার আম্মার বান্ধবী কুসুম খালার বাসায় অনেক পুরানো একটি কম্পিউটার ছিলো। উনারা সেই কম্পিউটার আর ব্যবহার করেন না। তাই সেই কম্পিউটারটি খালা আমাকে দিয়ে দিলেন।

যদিও ১৯৯৭, কম্পিউটার জগতে অনেকদিন পার হয়ে গেছে। আমার পাওয়া সেই পুরানো কম্পিউটারটি কিন্তু ছিল সত্যিই অনেক পুরানো। Philips-এর তৈরি কম্পিউটারটি IBM-XT compatible machine ছিল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, এটিতে ছিলনা কোন OS. সাহায্য নিলাম আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সামি আজিজের। তাদের বাসায় তখন কম্পিউটার ছিল। আমার কম্পিউটারের বর্ণনা শুনে সে MS-DOS নামক OS-একটি সাড়ে ৩ ইঞ্চির floppy disk-এ করে নিয়ে আসলো। অনেক কষ্ট করে ও আমার কম্পিউটারটাকে চালু করলো। কিছুক্ষণ চলার পর আমার প্রথম কম্পিউটার চিরনিদ্রায় চলে গেল। অনেক চেষ্টা করেও তাকে আর জীবিত করা গেল না। আমার আব্বা সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে একটি কম্পিউটার কিনে দেবেন। আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে কম্পিউটারের লিফলেট যোগাড় করতে শুরু করলাম। কিন্তু সর্বনিম্ন মূল্যের কম্পিউটারটিও আব্বার সাধ্যের বাইরে ছিলো। ফলে তখন আমার পক্ষে কম্পিউটার কেনা আর সম্ভব হলো না। আব্বাকে বলে রাখলাম এইচ,এস,সি-র পর আমি কম্পিউটার কিনবো, সে জন্য টাকা জমাতে। ১৯৯৭ সাল আমার জন্য কম্পিউটারে হাতছানির বছর। যদিও এ বছর আমি কম্পিউটারের দেখা পেয়েও পেলাম না, তবুও বছরটি আমার জন্য উল্লেখ্যযোগ্য কারণ, এই ঘটনাটি কম্পিউটারের প্রতি আমার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয় অনেক গুণে। আর এ বছরই আমি প্রথম Apple Computers Inc. এবং তাদের তৈরি Macintosh কম্পিউটার সম্পর্কে জানতে পারি। কম্পিউটার কেনার জন্য আমার আর আমার আব্বার আগ্রহ দেখে আমার খালু আনন্দ কম্পিউটার্স থেকে কম্পিউটারের দুইটি লিফলেট এনে দিলেন। প্রথমটি ছিল Apple-এর ছাপানো লিফলেট, তাদের তৈরি Mac OS 7 আর তার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়ে। অন্যটি ছিল আনন্দ কম্পিউটার্সের দামের list। সবক’টা Mac-এর দাম ছিল আব্বার ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে।

এইচ,এস,সি পড়ার জন্য আমি ভর্তি হলাম নটরডেম কলেজে। কলেজে ঢোকার পর দেখি কলেজে একটি কম্পিউটার ক্লাব আছে। আমি সেই ক্লাবে সদস্য হিসেবে যোগদান করলাম। তখন পর্যন্ত কিন্তু আমি কম্পিউটার অজ্ঞ। ক্লাব কম্পিউটারের হলেও, ক্লাবের কিন্তু খুব বেশি কম্পিউটার ছিলনা। যোগ দেবার পর কলেজ থেকে ক্লাবের জন্য কয়েকটি কম্পিউটার কেনা হলো। সদস্য অনেক, কিন্তু কম্পিউটার কম থাকায় আর কলেজের পড়ার চাপ অনেক বেশি থাকায় আমার পক্ষে কম্পিউটার ক্লাবে থেকেও কম্পিউটার সম্পর্কে তেমন কিছু জানা হয়নি। আসলে ক্লাবের দোষ দেয়াটা ঠিক হবে না। কারণ, আমার কম্পিউটার চালানোর থেকে ক্লাবের সাংগঠনিক কাজেই আগ্রহ ছিল বেশি। তাই বলে কম্পিউটারের ব্যাপারে আমার আগ্রহ কম ছিল তা কিন্তু বলা যাবে না। তখন টিভিতে মোস্তফা জব্বারের “কম্পিউটার” অনুষ্ঠানটি হতো। আমি এর প্রতিটি পর্ব দেখতাম। আমি এই সময় “কম্পিউটার জগত” ম্যাগাজিনের নিয়মিত পাঠক ছিলাম। আমার অনেক বন্ধুর তখন নিজের কম্পিউটার ছিল। ওদের কাছ থেকে আর কলেজের কম্পিউটার দুই এক বার চালিয়ে আমি Windows 95/98 সম্পর্কে কিছুটা জানলাম। ম্যাগাজিন পড়ে আর অনুষ্ঠান দেখে আমার internet, e-mail এগুলো সম্পর্কে কিছুটা ধারণা হলো। কম্পিউটার ক্লাবের একটি ম্যাগাজিন ছিল, নাম “কার্সর” এই ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজে আগ্রহ বোধ করলাম তাই এর জন্য বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে না পারলেও প্রেসের কাজ গুলোতে আমি বিশেষভাবে জড়িয়ে পড়লাম।

কলেজের সময়টা আমার কম্পিউটিং জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এসমযয়েই আমি Mac কেনার সিদ্ধান্ত নিই আর আমার আব্বাকে বলি, “আমি কিন্তু আব্বা বেশি দাম দিয়ে একটা ভাল কম্পিউটার কিনবো, এইচ,এস,সি-র পরে। দাম কিন্তু ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মতো পড়বে”।

প্রথম ম্যাক:

এইচ,এস,সি পরীক্ষার পর শুরু হলো ভর্তিযুদ্ধ। আমার target বুয়েট। বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার পরপরই আমি আব্বাকে বললাম আমাকে iMac কিনে দিতে হবে। এটা ১৯৯৯ সালের কথা। ১৯৯৮ সালে Steve Jobs Apple-এ ফিরে iMac ছেড়েছেন। iMac-এর দাম কিন্তু তখন $৯৯৯ (USA-তে)। কিন্তু যেদিন কিনতে যাবো সেদিন গিয়ে দেখি ওরা নতুন iMac (2nd Gen) ছাড়ছে এবং তার দাম ৬০,০০০ টাকা (USA-তে $799)। দাম কমে যাওয়ায় সুবিধাই হলো। কিনে নিলাম আমার নিজের প্রথম কম্পিউটার। কেনা হলো CiTech থেকে, তখনকার Apple distributor।

মহা উৎসাহে আমার iMac বাসায় আনার পর সেটা ছাড়া হলো। ছেড়েই তো আমি সমস্যায় পড়ে গেলাম। আমি ভেবে ছিলাম Mac OS-এর Apple মেনু হবে Windows-এর Start মেনুর মত। তাতে থাকবে Program Files। কিন্তু কোন Program Files খুঁজে পেলাম না। যা আছে তা হলো Recent Applications। এখানে উল্লেখ করা দরকার, তখন কিন্তু আমাদের অতিপ্রিয় Mac OS X release হয়নি। iMac-টাতে Mac OS 9 preinstalled ছিল। ২ দিন আমি ঘুমাইনি। সারাদিন রাত আমার iMac আর তার Mac OS 9 explore করেছি। আর মাত্র দুই মাসের মধ্যে আমি Mac OS 9-এ পাকা user হয়ে গেলাম। এর সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ease of use. আমার কাছে Mac OS Classic (Mac OS X-এর আগের সব version-এর কমন নাম) হচ্ছে দুনিয়ার সব চেয়ে সোজা OS। সব কিছু হাতের কাছে। যেখানে যেটা থাকা দরকার সেটাঠিক সেখানেই। আর ছিল resEdit। এই সফ্টওয়্যারটা একটা যাদুকরী সফ্টওয়্যার ছিল। এটা দিয়ে যে কোন সফ্টওয়্যারের ভেতরের resource পরিবর্তন করা যেত। মানে Photoshop বা Microsoft Word-এর startup splash screen, icon ইত্যাদি। শুধু তাই না, Mac OS-এর startup screen, appearence theme ইত্যাদিও পরিবর্তন করা যেত। resEdit ছিল আমার সাথী। আর এই সফ্টওয়্যারটা ছিল ফ্রি।

আমি Electrical and Electronic Engineering-এর ছাত্র ছিলাম, তাই আমাদের syllabus-এ programming ছিল। সমস্যা হলো আমি Mac-এর compiler কোথায় পাবো! তখন আমার বাসায় ছিল আব্বার লাগানো BTTB-এর dial-up সংযোগ। Internet-এ অনেক খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারলাম, Mac-এর সব চেয়ে জনপ্রিয় IDE-এর নাম Macromate Codewarrior, যা কিনা Apple বানায় না। বানায় Macromate নামের অন্য একটি company। আর সফ্টওয়্যারটি ছিল commertial। আমি তো professional developer না। তাই এটা কেনা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অনেক খুঁজে শেষ পর্যন্ত পেলাম Macintosh Programmers Workshop (MPW) যেটা কিনা Apple ফ্রি distribute করে।

বাংলা আর Mac OS X:

এরপরের ঘটনাটা ২০০২ সালের। তখন Apple Mac OS X ছেড়েছে। শুধু তাই না, একটা update-ও ছেড়েছে। BCS Computer Show-তে গেলাম ম্যাকের distributor-এর সন্ধানে। কারণ ততোদিনে CiTech-এর দোকান উঠে গেছে। Apple-এর একটা দোকান দেখে কাছে গেলাম। কথা হলো কামাল ভাইয়ের সাথে। উনি SATCOM Computers-এ ম্যাক service engineer হিসেবে কাজ করেন। উনার কাছে জিজ্ঞেস করলাম। উনি আমাকে Mac OS X লাগিয়ে দিতে পারবেন কি না। উনি বললেন পারবেন। আমি বুয়েটে পড়ি শুনে উনি আমার সাথে নতুন OS-এর একটি সমস্যার কথা তুলে ধরলেন। আর তা হলো Mac OS X-এ বাংলা লেখা যায় না। Mac OS Classic-এ বাংলা লেখার একমাত্র উপায় হলো ১৯৮৭ সালে develop করা বিজয়। যদিও ম্যাকের জন্য লিখনী ছিল, তবুও বিজয় ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বাংলাদেশের Printing Industry-তে এই বিজয়েরই আধিপত্য। কিন্তু Apple-এর Mac OS X-এ বিজয় একেবারেই চলে না। তাই সবাই বাংলা লেখার জন্য Classic Environment-এ পুরোন সফ্টওয়্যার চালিয়ে বাংলা লিখতো। সবাই চাইতো Mac OS X ব্যবহার করতে। কিন্তু বাংলা support-এর অভাবে সেটা আর করা যাচ্ছিলনা। আমার কাছে সমস্যাটা খুব interesting মনে হলো। সুতরাং আমি এই সমস্যা সমাধানের কাজে লেগে পড়লাম।

বাংলা নিয়ে প্রথম অভিজ্ঞতা:

যেহেতু সেই আমলে আমি ম্যাক কিনেছিলাম, আমার distributor আমাকে অনেক সফ্টওয়্যারের পাইরেটেড কপির সাথে বিজয়ের একটা কপি দিয়েছিল। এটা আসলে একটা System Extension ছিল। আমি ওটা লাগালাম। দেখলাম System boot করার splash screen-এ বিজয়ের সাদাকালো লোগো, Copyright holder হিসেবে মোস্তফা জব্বারের নাম, Author হিসেবে গোলাম ফারুক আহমেদের নাম। সেই সময় আমি মোস্তফা জব্বার সাহেবের খুব ভক্ত ছিলাম। কারণ ছিল BTV-তে তার কম্পিউটার অনুষ্ঠান। আর সব জায়গায় উনি নিজেকে একজন প্রোগ্রামার হিসেবে পরিচয় দেন। বুয়েটে ঢোকার পর আমি যেটা আবিষ্কার করি সেটা হলো আমার প্রোগ্রামিংপ্রীতি। আমি কম্পিউটারের মাধ্যমে যে কোন সমস্যা সমাধান করতে খুব পছন্দ করতাম। যদিও আমি ম্যাকে আমার programming course গুলো করেছি, কিন্তু ম্যাকের জন্য কি-বোর্ড কিভাবে বানাতে হয় সেটা আমার জানা ছিলনা। জানা ছিল original বিজয় developer-দের। আমার দরকার ছিল তাদের সাথে কথা বলার। সুযোগ পেয়ে গেলাম সেই মেলাতেই। Apple তখন কেবল Xserve ছেড়েছে। বাংলাদেশের Apple-এর distributer-রা Xserve-এর introduction করছিলেন ঐ মেলাতেই। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তা ছিলেন মোস্তফা জব্বার সাহেব। আমি ঐ অনুষ্ঠানে গেলাম শুধু জব্বার সাহেবের সাথে কথা বলার জন্য। অনুষ্ঠান শেষ হতেই আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম উনি কিভাবে কাজটা করেছেন, কি কি tool ব্যবহার করেছেন? আমি জানালাম আমি MPW ব্যবহার করেছি। উনি আমাকে উনার ফোন নম্বরটা দিয়ে বললেন যে আমাকে senior programmer হিসেবে সহায়তা করবেন। আমিও খুশি মনে উনার ফোন নম্বর নিয়ে বাসায় চলে গেলাম। সম্ভবত পরের দিন আমি উনাকে ফোন করলাম কথা বলার জন্য। কিন্তু পরের দিনের মোস্তফা জব্বার আর আগের দিনের মোস্তফা জব্বারের মধ্যে কোন মিল খুঁজে পেলাম না। আগের দিন জব্বার ছিলেন একজন confident senior Macintosh Programmer। কিন্তু পরেরদিন উনি আমাকে যা বললেন তা শুনেই আমি বুঝে গেলাম উনি আসলে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। উনি আমাকে MPW-এর একটি বই কিনতে সহায়তা করতে চাইলেন। এ ছাড়া উনি আমাকে আর কোন রকম সাহায্য করতে পারবেন না। জব্বার সাহেবের মুখোশ আমার সামনে খুলে গেল। আর এই দিন থেকেই আমি তাকে পছন্দ করা থেকে ঘৃণা করতে শুরু করলাম। পরে অবশ্য আমি জানতে পারলাম বিজয়ের প্রকৃত প্রোগ্রামার হলেন গোলাম ফারুক আহমেদ। জব্বার সাহেব আর উনি প্রথমে একই সাথে ব্যবসা করতেন কিন্তু পরে তাদের মধ্যে বিরোধের কারণে তারা আলাদা হয়ে জান এবং এর পর থেকে ম্যাকের বিজয়ের আর কোন উন্নতি হয়নি। আর জব্বার সাহেবে যেহেতু প্রোগ্রামিং পারেননা, তাই অন্য লোক দিয়ে Window-এর বিজয় বানিয়েছেন। যার ফলে Windows আর Mac বিজয়ের document incompatible ছিল। কিন্তু সবসময়ই উনি নিজেকে বিজয়ের প্রোগ্রামার হিসেবে পরিচয় দিতে চান। এরপর আমি আর জব্বার সাহেবের সাথে কোন কথা বলতে যাইনি।

Unicode, ম্যাক আর বাংলা:

এরপর আমি নিজেই internet-এ খোঁজাখুঁজি শুরু করি। জানতে পারি Unicode সম্পর্কে। Apple Developer Mailing list-এ mail পাঠাতে থাকি। একদিন আমার একটা mail-এর reply-এ (উনার নাম আমার মনে নেই) আমি পেয়ে যাই Deborah Goldsmith-এর e-mail address। তারপর উনাকে mail করি। উনি আমাকে Apple Font Tool আর এর documentation-এর সন্ধান দেন। আমি net থেকে এগুলো নামিয়ে শিখতে শুরু করি। জানতে পারি Mac plaftorm-এ কিভাবে Unicode implement করতে হয়। জানতে পারি Apple Advance Typography (AAT) সম্পর্কেও। আরও বিস্তারিত ভাবে জানার জন্য Deborah আমাকে introduce করে দিলেন। Lee Collins-এর সাথে। Lee আমাকে সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বহুবার সাহায্য করেছেন। মূলতঃ Lee-এর সহায়তা আর জামিল চৌধুরীর অভিধান ছাড়া হয়তো আমার পক্ষে বাংলা কম্পিউটিং-এ কাজ করা অনেক কঠিন হয়ে যেত।

বাংলা নিয়ে আমার সমস্যা:

এগুলো শেখার পর আমি এক মহাসমস্যায় পড়ি। – বাংলায় যুক্তাক্ষর কতগুলো??  আমি ভাবলাম এর উত্তর থাকবে বাংলা ব্যাকরণ বই গুলোতে। কিন্তু পেলাম না। বিজয়ের font গুলো font editor-e খুলে দেখলাম। কোন লাভ হলো না। বাংলার ছাত্র শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করেও কোন ভাল উত্তর পেলাম না। ২০০৪ সালে আমার iMac-এর CMOS battery খারাপ হয়ে গেল। তাই ঠিক করতে শরণাপন্ন হলাম কামাল ভাইয়ের। সৌভাগ্যবশতঃ আমার সাথে সেদিন দেখা হয়ে গেলো Prof. জামিল চৌধুরীর। উনি বাংলা একাডেমীর জন্য অভিধান লেখেন। লেখার জন্য উনি Mac-এ শহীদলিপির ফন্ট গুলো ব্যবহার করেন। কিন্তু Mac OS X-এ উনিও সমস্যায় পরে গেছেন। কারণ আগের OS-এ English কি-বোর্ড দিয়েই উনি লিখতে পারতেন। কিন্তু OS X-এ সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আমি কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর আবিষ্কার করলাম, যে UK কি-বোর্ড ব্যবহার করলে শহীদলিপির ফন্ট গুলো কাজ করে। উনি খুশি হয়ে আমাকে উনার লেখা এক অমূল্য অভিধান উপহার দিলেন। এখানে বলে রাখা দরকার, এই অভিধানটি আমার develop করা সব বাংলা সফ্টওয়্যারের ভিত্তি। আজকের Bangla-অঙ্কুর develop করতে আমাকে ক্ষণে ক্ষণে এই অভিধানের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। এই অভিধানেই আমি ৯০% বাংলা যুক্তাক্ষরের সন্ধান পাই। বাংলা শব্দের নির্ভুল ফনেটিক উচ্চারণ দেওয়া আছে এতে।

এরপর আসলো অন্য সমস্যা। আমি ভাল আঁকতে পারিনা। আর Typography বা Calligraphy সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই ছিল না। অনেক চেষ্টা করেও আমি “অ” ঠিক মত বানাতে পারছিলাম না। সমাধান পেলাম ekushey.org-এর কাছে। ওরা বেশ কিছু ভাল মানের বাংলা ফন্ট Open Source করে দিয়েছে। এর মধ্যে থেকে আমি সোলাইমানলিপি আর রূপালী ফন্ট দু’টোকে নির্বাচন করলাম Mac-এ কনভার্সনের জন্য। বুয়েট থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করি ২০০৫ সালে। পাশ করার পর আমি চাকরী খুঁজছি আর বাসায় বসে বসে বাংলা ফন্ট conversion-এর কাজ করছি। Mac OS X 10.4 Tiger-এ Apple নতুন কি-বোর্ড xml দিয়ে কি-বোর্ড বানানোর নতুন পদ্ধতি চালু করলো। আমি Lee-এর সহায়তা নিয়ে কি-বোর্ড বানানোর কাজ শুরু করলাম। এবারও প্রথমে চোখ পড়লো বিজয়ের দিকে। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কি-বোর্ড (সেই সময়ের)। কিন্তু বুঝে গেলাম যত গর্জে তত বর্ষে না। বিজয় সম্পূর্ণভাবে একটি বাঁ হাতি কি-বোর্ড। শুরু করলাম গবেষণা দ্রুত গতির কি-বোর্ড বানাতে। একটা কি-বোর্ড বানিয়েই ফেললাম। কিন্তু উপলব্ধি করলাম যে এই কি-বোর্ড অন্যরা ব্যবহার করতে নাও পারে। তাই এই কি-বোর্ডটি এখনো অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।

ম্যাকে প্রথম Unicode বাংলা:

যেহেতু একুশের ফন্ট ব্যবহার করে আমি আমার সফ্টওয়্যার develop করে ছিলাম তাই তাদের সাথে যোগাযোগ করি। কথা হয় অমি আজাদের সাথে। উনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন Robin Upton-এর সাথে। মূলতঃ Robin-ই আমাকে ekushey-এর মাধ্যমে আমার বাংলা solution publish করতে বলেন। আমিও এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে রাজী হয়ে যাই। ২০০৬ সালে আমি ekushey.org-এর মাধ্যমে প্রথম বাংলা solution প্রকাশ করি। আমার প্রকাশিত ফন্ট দুইটিই Mac platform-এ Unicode বাংলা কম্পিউটিং-এর সূত্রপাত ঘটায়। আমার পাশাপাশি সুপ্রিয় সেন স্বতন্ত্র ভাবে একটি বাংলা ফন্ট ছাড়েন কিন্তু তা জনপ্রিয়তা পায়নি। কারণ ekushey.org-এ সব plafrom-এর জন্য solution পাওয়া যেত। আর এর সুফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। এরপর আমি শুরু করি আমার চাকুরী জীবন। আর এর সাথে কমে আসে বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করার সুযোগ। ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আমি বাংলা কম্পিউটিং-এ কাজ করতে না পারলেও OpenType থেকে Mac-এর AAT conversion-এর জন্য একটি tool বানিয়ে ফেলি। ২০০৮ সালে PhD করার জন্য আমি চলে আসি যুক্তরাজ্যে। দেশে ফেলে আসি আমার সেই অমূল্য অভিধান। যার ফলে আমার পক্ষে বাংলা কম্পিউটিং-এর ওপর নতুন কোন কাজ করা খুব একটা সম্ভব হয়নি। তবে আমার বানানো OpenType to AAT converter দিয়ে আমি একুশের সবক’টি ফন্ট Mac-এ ব্যবহার উপযোগী করে ফেলি। কিন্তু প্রকাশ করার মতো সময় হয়ে ওঠেনি। ঠিক এই সময়টাতেই Windows-এর অভ্র ফনেটিক কি-বোর্ড বাংলা কম্পিউটিং-এর রেনেসাঁর সুত্রপাত করে। Unicode বাংলায় ছেয়ে যায় সারা বিশ্ব। কিন্তু Mac ব্যবহারকারীদের জন্য কোন ফনেটিক solution কেউ নিয়ে আসেনি। অভ্র developer-গণ Windows developer, তাই তাদের পক্ষে Mac অভ্র বানানো সম্ভব ছিলনা। অতি সম্প্রতি অভ্র Linux version-এর beta release হয়েছে।

ম্যাকে প্রথম ফনেটিক কি-বোর্ড, Bangla-অঙ্কুর:

আমি বাংলা কম্পিউটিং-এ আবার ফিরে আসি ২০১০ সালে। আমার এবারের উদ্দেশ্য হলো mac-এর জন্য একটি ফনেটিক কি-বোর্ড বের করা। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময় আমি দেশে যাই। আর হাতে পেয়ে যাই সেই অমূল্য অভিধান। শুরু করি আমার নতুন প্রজেক্ট, Bangla-অঙ্কুর। জামিল চৌধুরীর অভিধানটি এতোই চমৎকার যে মাত্র ২ মাসেই বাংলাদেশে বসে আমি তৈরি করে ফেলি Bangla-অঙ্কুরের basic rendering engine। UK ফিরবার সময় কিন্তু সেই অমূল্য অভিধান নিয়ে আসতে ভুলিনি। UK ফিরে আমি সেই engine-কেই পরিশীলিত করি আর প্রকাশিত হয় Macintosh platform-এর প্রথম বাংলা ফনেটিক কি-বোর্ড Bangla-অঙ্কুর।

 

-এস, এম, রাইয়ান কবির

 

2 Responses to ম্যাক, আমি আর বাংলা

  1. অসাধারণ একটা কাজ করেছেন আপনি। Bangla অঙ্কুর না থাকলে হয়তো আমার জন্য mac এ বাংলা লেখাটা এত সোজা হতোনা। আপনি বাঙালীর গর্ব। iPhone er জন্য কিছু ভাবছেন কি ?

    ভাল থাকবেন।

    • রাইয়ান says:

      ধন্যবাদ আপনাকে। iPhone-এর জন্য কি-বোর্ড বানানোর Application Programming Interface (API) Apple উন্মুক্ত করেনি। যার ফলে আমার পক্ষে কি-বোর্ড বানানো সম্ভব হচ্ছে না। আশা করি ভবিষ্যতে Apple API উন্মুক্ত করবে।